মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কথা বলার কারণে সাংবাদিকদের হাতে হাত কড়া
মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কথা বলার কারণে সাংবাদিকদের হাতে হাত কড়া
বৃহস্পতিবার ঢাকায় যারা মবের শিকার হয়ে পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলেন. পুলিশ তাদেরই আটক করে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। অন্যদিকে যারা মব তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা তো দূরের কথা এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সকালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ ১৬ জন সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টর্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘মঞ্চ ৭১’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে এক গোলটেবিল আলোচনায় গিয়ে মবের শিকার হন। তার ২০ ঘণ্টা পর আদালতের মাধ্যমে তাদের ঠাঁই হয় কারাগারে। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন ওই সংগঠনের প্রধান অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেয়ার কথা ড. কামাল হোসেনের। দুজনই ওই অনুষ্ঠানে শেষ পর্যন্ত যাননি।
হামলার শিকার ১৬ জনকে পুলিশ প্রথমে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তখন নিরাপত্তার জন্য নেয়ার কথা বলা হলেও রাতে তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হয়। এরপর শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাদের আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনকে যখন আদালতে তোলা হচ্ছিল, তার এক হাতে ছিল হাতকড়া আরেক হাতে বাংলাদেশের সংবিধান৷ সেই সংবিধান উঁচু করে ধরে তিনি বলছিলেন, “৩০ লাখ শহিদের বিনিময়ে, পাঁচ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে এই সংবিধান। এই সংবিধান আমরা রক্ষা করবো। বাংলাদেশকে আমরা রক্ষা করবো। মুক্তিযুদ্ধ আমরা রক্ষা করবো।”
সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না তার এক হাতের হাতকড়া তুলে দেখিয়ে বলেন, “দেখুন, আপনারা দেখুন, এই হাত দিয়ে আমরা লিখি। এই হাত ভেঙে দিচ্ছে, এই হাতে হাতকড়া পরাচ্ছে৷ মানুষ কী লিখবে? সাংবাদিকরা কী লিখবে? কার পক্ষে লিখবে সাংবাদিকরা? বলুন আপনারা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বলি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই হাত দিয়ে লিখি।” কাছ থেকে কেউ একজন ‘‘দেশবিরোধী যে অভিযো সেটা কতটা সত্য?’’ প্রশ্ন করলে মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেন, “আপনাদের মনে হয় যে আমরা সন্ত্রাস করতে পারি? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলা- এগুলো সন্ত্রাস করা? দেশের সূর্য সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছেন। তাদের সঙ্গে থাকা সন্ত্রাস করা?এটা আপনাদের মনে হয়? এই প্রশ্ন আপনারা করছেন?”
সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত সাবেক সাংসদ, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ ১৬ জনকে শুক্রবার সকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে হাজির করা হলে লতিফ সিদ্দিকী ছাড়া বাকি সবার পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করলে তাদের জামিন না দিয়ে সবাইকে কারাগারে পাঠানো হয়। লতিফ সিদ্দিকী ‘এ আদালতের প্রতি আস্থা নেই’ জানিয়ে এবং ‘এ আদালতে তিনি বিচার পাবেন না’- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে আইনজীবী নিয়োগ করেননি। তার আইনজীবী হতে ওকালতনামায় স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করেন অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম সাইফ। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী স্বাক্ষর না করে জানান, আদালতের প্রতি তার কোনো আস্থা নেই৷ এ আদালতে তিনি বিচার পাবেন বলে মনে করেন না- এ কারণে তিনি কোনো আইনজীবী নিয়োগ দেবেন না। আইনজীবী জানতে চান, তিনি আদালতে কোনো কথা বলতে চান কিনা৷ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, আদালতের কাছে কোনো বক্তব্যও তিনি দেবেন না। আদালতের প্রতি অনাস্থার কারণে জামিনের আবেদন না করে, আদালতে কোনো বক্তব্য না দিলেও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকী।
সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টর্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা চলার সময় মব-হামলা চালিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া ১৬ জনকেই শুক্রবার হাতকড়া, হেলমেট ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেটি পরিয়ে আদালতে নেয়া হয়। লতিফ সিদ্দিকী, শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ও মঞ্জুরুল আলম পান্না ছাড়া অন্যরা হলেন আব্দুল্লাহ আল আমিন (৭৩), কাজী এটিএম আনিসুর রহমান (৭২), গোলাম মোস্তফা (৮১), মহিউল ইসলাম (৬৪), জাকির হোসেন (৭৪), তৌছিফুল বারী খান (৭২), আমির হোসেন সুমন (৩৭), আল আমিন (৪০), নাজমুল আহিসান (৩৫), সৈয়দ শাহেদ হাসান (৩৬), শফিকুল ইসলাম (৬৪), দেওয়ান মোহাম্মদ আলী (৫০) এবং আব্দুল্লাহীল কাইয়ুম (৬১)।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, ১৬ জনের মধ্যে দুজন পথচারী।
কেন, কার বিরুদ্ধে, কী অভিযোগ?
শাহবাগ থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, “তারা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছিল।” রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. শামসুদ্দোহা সুমন ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেন, “তারা ইউনূস সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তারা যে সংগঠনের ব্যানারে কাজ করছেন মঞ্চ ৭১, ওই সংগঠনটি করাই হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে। এই কারণেই এই বছরের ৫ আগস্ট সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিল গত বছরের ৫ আগষ্ট।”
তারা সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করেছেন তার কোনো প্রমাণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মামলা হয়েছে। এখন তদন্ত করলে প্রমাণ পাওয়া যাবে। বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারেও একইরকম একটি ষড়যন্ত্র হয়েছে এর আগে। সে বিষয়ে মামলা ও আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। তার সঙ্গে এটার যোগসূত্র আছে।”
অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমীন রাখি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হতে হলে আসামিদের প্রথমে একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হতে হবে। কিন্তু তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তারা কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য নয়। তাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন আইনের অধ্যাপক, একজন সাংবাদিক। তাদের কেউ কেউ জুলাই আন্দোলনে ছিলেন। তাদের ওপর মব করা হয়েছে। তাদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়েছে। কিন্তু মবকারীদের আটক না করে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে উল্টো যারা ভিকটিম তাদের আটক করে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো। এতে দেশে মব আরো বাড়বে। মানুষ আরো নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। এটা খুব খারাপ দৃষ্টান্ত হলো।”
আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমীন রাখির অভিযোগ, ” আসামীদের আইনি সুবিধা দেয়া হয়নি। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি। তাদের ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটক রেখে শুক্রবার ছুটির দিন সকালেই আদালতে পাঠানো হয়েছে, যাতে তারা আইনি সহায়তা না নিতে পারেন।”
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খালিদ মনসুর বলেন, ” তথ্য-প্রমাণ কী পাওয়া গেছে তা এখন বলা যাবে না। মামলার তদন্ত চলছে। আগামীকাল তাদের রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হবে।” যারা মব করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” না, কোনো মামলা হয়নি। এটা নিয়েও আমরা তদন্ত করছি। তদন্তের পরে দেখা যাবে।”